রিটন আহমদ দিপু :
দেশজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে প্রবল সংক্রামক রোগ হাম। শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোগে বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে হামের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রেখেছে। দেশের অধিকাংশ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সিলেট বিভাগেও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সিলেট বিভাগে হাম উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশু মারা গেছে।
সিলেট নগরসহ বিভাগের বিভিন্ন উপজেলায় শিশুদের মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে। বিশেষ করে চা-বাগান এলাকা, সীমান্তবর্তী অঞ্চল, বস্তি ও নিম্নআয়ের পরিবারে আক্রান্তের হার বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্গুলোতে প্রতিদিন নতুন রোগী আসছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুই নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকা নেয়নি।
হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সূত্র জানায়, বর্তমানে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-দেশব্যাপী হাম-রুবেলা বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশু শনাক্তকরণ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অতিরিক্ত টিকাদান বুথ চালু, স্কুল ও মাদ্রাসাভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, হাসপাতালে বিশেষ চিকিৎসা সেল প্রস্তুত রাখা, আক্রান্ত এলাকায় জরুরি নজরদারি বৃদ্ধি, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সরবরাহ বাড়ানো। সরকার ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ‘ডোর টু ডোর’ টিকাদান কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, চা-বাগান, পাহাড়ি অঞ্চল ও বস্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সিলেট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেছেন, শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তিনি জানান, নির্ধারিত বয়স অনুযায়ী শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। হামের টিকা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙ্ েবিশেষ নজরদারি টিম গঠন করা হবে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পর্যায়ে মেডিকেল ক্যাম্প বাড়ানো হবে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনও হাম প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছে। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে-নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হচ্ছে, বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্প হচ্ছে, ওয়ার্ডভিত্তিক সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো হচ্ছে, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে ।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিগত প্রায় দুই মাস যাবত বাংলাদেশে হাম রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে এবং যার ধারাবাহিকতায় সিলেট বিভাগে আগে হাম আক্রান্ত বা প্রকোপ কম থাকলেও অল্প কিছুদিন যাবত সিলেট বিভাগে কিন্তু হামের প্রকোপ বেড়েছে এবং আমাদের মৃত্যুও বেড়েছে হামের কারণে। আমরা জানি গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন শিশু ঝরে গেছে এই হামের প্রকোপে। আমরা সিলেট বিভাগে হাম রোগের ক্যাম্পেইন কিন্তু একটু দেরিতে শুরু করেছিলাম। বর্তমানে হামের ভ্যাকসিনের ‘এচিভমেন্ট’ অলমোস্ট শতকরা ৯০ দশমিক ৮৯ ভাগ বা কখনো কারো কারো ক্ষেত্রে শতভাগ ‘অ্যাচিভ’ হয়ে গিয়েছে। হামের ভ্যাকসিন দেওয়ার পর ২১ দিন থেকে ২৮ দিন সময় প্রয়োজন। আরও একমাস পর্যন্ত আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও যদি বাচ্চার জ্বর বা হামের র্যাশ হয় তাহলে আমরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। তিনি জানান, আমরা আরেকটা জিনিস খেয়াল করছি, যে সমস্ত বাচ্চাদের পুষ্টির অভাব আছে তারা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি।
সিলেট বিভাগে মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে
এ নিয়ে বিভাগে হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের বুলেটিনে মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য জানানো হয়। মৃত তিন শিশুর সবাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মধ্যে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৬ মাস বয়সী ইশিতা কাহের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৯ মাস বয়সী সুমিতা এবং সিলেট সদরের ৯ মাস বয়সী লাবিবা মারা যায় শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৯২ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ২৮১ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। এরমধ্যে শহীদ ডা. শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৭০ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৭ জন রয়েছে। মোট ৪০ জন মৃতের মধ্যে ৪ জন নিশ্চিত হামে এবং ৩৬ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুনির ওমর রাশেদ জানান, হামের প্রকোপ বৃদ্ধির কারণে ওসমানী হাসপাতালে ২০টি এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৪টি আইসিইউ বেড বাড়ানো হয়েছে।
হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।




















