রিটন আহমদ দিপু ::
একদিকে পাসের হারে বড় ধস, অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যায় উল্টো চিত্র। এমন বৈপরীত্যের ফলাফল এসেছে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এ বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশই অকৃতকার্য হয়েছে। তবে পাসের হার কমলেও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ২২২ জন বেড়েছে। এবার পূর্ণ জিপিএ পেয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন।
সোমবার সকাল ১০টায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে ফলাফল ঘোষণা করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন। ফল প্রকাশের পর বোর্ডের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছর ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮৯ হাজার ৪২১ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন। গত বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ২ হাজার ২১৯ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ১২ হাজার ৭৯৮ জন।
২০২৫ সালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছরে পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৩ হাজার ৬১৪ জন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন।
এর আগে ২০২৪ সালে সিলেট বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৫ হাজার ৪৭১ জন। ফলে গত দুই বছরের ধারাবাহিকতায় পাসের হার কমলেও ২০২৬ সালে জিপিএ-৫-এর ক্ষেত্রে সামান্য ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা গেছে।
এবার সিলেট বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৩৫ হাজার ৫৩০ জন, আর ছাত্রী ৫৩ হাজার ৮৯১ জন। অর্থাৎ ছাত্রের তুলনায় ১৮ হাজার ৩৬১ জন বেশি ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। ফলাফলেও ছাত্রীদের সাফল্য ছাপিয়ে গেছে ছাত্রদের। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পাসের হার ও জিপিএ-৫-দুই সূচকেই ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছে। ফলাফলে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে- পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমার পাশাপাশি সামগ্রিক ফলাফলে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। গত বছর ১ লাখ ২ হাজার ২১৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭০ হাজার ৯১ জন পাস করেছিল। এবার পরীক্ষার্থী কমে ৮৯ হাজার ৪২১ জন হলেও পাস করেছে মাত্র ৫১ হাজার ৯৫৭ জন।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চার জেলার মধ্যে পরীক্ষার্থী সংখ্যায় এগিয়ে সিলেট জেলা। এ জেলায় ৩৫ হাজার ৩৩১ জন পরীক্ষার্থী ৩৬৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ৯৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ছাত্র ১৪ হাজার ৩২১ ও ছাত্রী ২১ হাজার ১০ জন। মৌলভীবাজারে পরীক্ষার্থী ছিল ১৯ হাজার ৯১৩ জন। জেলার ১৯৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৩৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়। এর মধ্যে ছাত্র ৭ হাজার ৬৩১ এবং ছাত্রী ১২ হাজার ২৮২ জন। সুনামগঞ্জে পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ হাজার ৩৮৩ জন। ২৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৪৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেয়। ছাত্র ৭ হাজার ৫১৫ এবং ছাত্রী ১০ হাজার ৮৬৮ জন। অন্যদিকে হবিগঞ্জে পরীক্ষার্থী ছিল ১৫ হাজার ৭৯৪ জন। ১৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৪৯টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেয়। এর মধ্যে ছাত্র ৬ হাজার ৬৩ এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৭৩১ জন।
ফলাফলের জেলা-ভিত্তিক চিত্রে পাসের হারে সুনামগঞ্জ এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় মৌলভীবাজার শীর্ষে রয়েছে।
এবারের এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। প্রথম দিন সিলেট বিভাগের চার জেলায় ২২৫টি কেন্দ্রে বাংলা (আবশ্যিক) প্রথম পত্র পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন মোট ৭০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৯ হাজার ৪১০ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়; অনুপস্থিত ছিল ৬৭৪ জন। সিলেট জেলায় ২৪১, সুনামগঞ্জে ১৭০, মৌলভীবাজারে ১১৮ এবং হবিগঞ্জে ১৪৫ জন অনুপস্থিত ছিল। কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী বহিষ্কার বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এবারের পরীক্ষা ছিল আরও কঠোর নজরদারিতে। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনায় প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল নকলমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা। এসএসসি পরীক্ষার সময় সিলেটের আবহাওয়া ছিল বৃষ্টিপ্রবণ। পরীক্ষার সময়ে বিভিন্ন দফায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ছিল। রাজনৈতিক অঙ্গণেও ছিল কিছুটা উত্তাপ।
সিলেট বোর্ডে টানা দুই বছর পাসের হার কমে যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, কেন ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে সিলেটের শিক্ষার্থীরা; ২০২৪ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশে। এবার আরও বড় পতন হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে।
অন্যদিকে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি জানান দিচ্ছে, ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আরও ভালো করেছে। কিন্তু সামগ্রিক পাসের হার ১০ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে যাওয়া স্পষ্টতই সিলেটের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।
পাসের হার কমার বিষয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে বলেন, পরিবর্তিত সিলেবাস, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবং দক্ষ শিক্ষকের সংকটের কারণে এবার পাসের হার কমেছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও গণিতে তুলনামূলক বেশি অকৃতকার্য হয়েছে। এসব বিষয় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, এবার প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। ফলে শিক্ষার্থীরা একটি স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার পরিবেশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল এবং সেই অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।



















