Ekattorer Kotha
শুক্রবার , ৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১২ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আলোচিত
  5. ইপেপার
  6. ক্রিকেট
  7. খুলনা
  8. খেলা
  9. চট্রগ্রাম
  10. জাতীয়
  11. ঢাকা
  12. দেশের ভেতরে
  13. প্রবাসের কথা
  14. প্রযুক্তি
  15. প্রেসবক্স

সিলেটে যেভাবে এলো ‘লাকড়ি তোড়া’ উৎসব

                       

এপ্রিল ৩, ২০২৬
                   

স্টাফ রিপোর্ট ::
সিলেটে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান হযরত শাহজালাল (রহ.)‑এর ৭০৭তম লাকড়ি তোড়া উৎসব আগামী বুধবার (১৫ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবছর ২৬ শে শাওয়াল হযরত শাহজালাল (রহ.)‑এর মাজারে লাকড়ি তোড়া উৎসব পালন করা হয়।

আগামী ৭ ও ৮ মে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে ওরস অনুষ্ঠিত হবে। ওই ওরসের শিরণি রান্না হবে লাকড়ি তোড়া উৎসব থেকে সংগ্রহ করা লাকড়ি দিয়ে।

লাকড়ি তোড়া উৎসব সিলেটের ইতিহাস ও লোকবিশ্বাসে এক অনন্য জায়গা অধিকার করে আছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না লাকড়ি তোড়া উৎসবের পটভূমি ও তাৎপর্য। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি মানবিক সহমর্মিতা, ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের সাক্ষী।

জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৩শ শতকের শুরুর দিকে ৩৬০ জন অনুসারীকে নিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল অত্যাচারী রাজা গৌড়গোবিন্দকে পরাজিত করে এখানে শান্তি ও ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়া। বহু রণবীরত্ব, সংঘর্ষ ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি সিলেটের দক্ষিণ সীমান্তে এসে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। মানবিক দরবেশ হিসেবে হযরত শাহজালাল (রহ.) যুদ্ধের মাধ্যমে নয়, কৌশল ও নৈতিকতার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন।

সিলেট অভিযান ও গৌড়গোবিন্দের দুর্গ অবরোধের সময় তাঁর বহু অনুসারী ও সৈন্য শহীদ হন। সময় সিলেট অঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো নগণ্য। ছিলো না কোনো নির্দিষ্ট গোরস্থান। তাই যেখানেই তাঁরা মারা যান, সেখানেই তাদের দাফন করা হয়। আর সেই শহীদদের যেসব স্থানে দাফন করা হয়, সেসব স্থানে আজও আউলিয়াগণের মাজার হিসেবে দেখা যায়।

শেষ পর্যন্ত গৌড়গোবিন্দ পলায়ন ও তার বাহিনী আত্মসমর্পণ করলে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর অনুসারীরা ২৬ শে শাওয়াল তারিখে সিলেট শহরে প্রবেশ করেন। সেই দিনই সিলেটে ইসলামের বিজয় নিশান উত্তোলিত হয় এবং পরবর্তীতে এটি প্রতি বছর উৎসবের আকারে পালন করা হয়।

সিলেটে আগমনের পরের বছরগুলোতে হযরত শাহজালাল (রহ.) নৈতিক শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার উপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ার নির্দেশ দেন। একবার এক নওমুসলিম কাঠুরিয়া ভক্ত তার দু’জন বিবাহযোগ্য কন্যা নিয়ে দরবেশের দ্বারস্থ হন। লোকটি কাঠুরিয়া হওয়ায় তার দুই মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আসছে না জানার পর হযরত শাহজালাল (রহ.) ওই কাঠুরিয়াকে আগামী ২৬ শে শাওয়াল বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে বলেন। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের দিন আগত সকল ভক্তদের নিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেটের উত্তরপাশে টিলাঘেরা ঘন জঙ্গলে যান। সেখানে তিনি ভক্তদের জঙ্গলের গাছ থেকে লাকড়ি তোড়া বা কাঠ ভাঙার/কাটার নির্দেশ দেন। তিনি নিজেও ভক্তদের সাথে লাকড়ি কেটে নিজ আস্তানায় ফিরে আসেন। যে স্থান থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করা হয়, সেই স্থানটি আজ লাক্কাতোড়া বা লাক্কাতুরা নামে পরিচিত। মূলত লাকড়ি তোড়া থেকেই লাক্কাতুরার উৎপত্তি।

ওই দিন আছরের নামাজের পর হযরত শাহজালাল (রহ.) সমবেত জনতার প্রতি নসীহত করতে দাঁড়িয়ে প্রথমেই প্রশ্ন করলেন- আমরা আজ কি কাজ করলাম? সমস্বরে আওয়াজ হলো- আমরা আজ লাকড়ি কেটে নিয়ে এলাম। আবার প্রশ্ন হলো- আজ থেকে আমরা সবাই কি কাঠুরিয়া নই? সমস্বরে আবার আওয়াজ হলো- হ্যাঁ! আজ থেকে আমরা সকলেই কাঠুরিয়া।

হযরত শাহজালাল (রহ.) মুচকি হেসে সেই কন্যা দায়গ্রস্ত কাঠুরিয়াকে দেখিয়ে বললেন, এই লোকটি একজন কাঠুরিয়া। এর দুজন উপযুক্ত কন্যা আছে, তোমাদের মধ্যে কারা এদের বিবাহ করতে রাজি আছো? অনেকেই হাত তুলে সম্মতি জানাল। তিনি এদের মধ্যে থেকে দুজন উপযুক্ত পাত্র দেখে মেয়ে দুটির বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। এভাবেই তিনি কাঠুরিয়া ব্যক্তির দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তৎকালীন সমাজে শ্রেণিবৈষম্য দূর করে একতা ও সহমর্মিতা দৃঢ় করেন।

এদিকে, কেটে আনা বিপুল পরিমাণ লাকড়ির কি হবে সেটা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়, তখন হযরত শাহজালাল (রহ.) বলেন, রেখে দাও, লাকড়িগুলো কাজে লাগবে। তাঁর কথা কিছুদিনের মধ্যেই সত্যি হয়। মাত্র ২২ দিন পর ১৯ শে জিলক্বদ তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালের খবরে দূর দুরান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত-মুরীদের আগমন ঘটে। তাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে রান্নাবান্নার জন্য প্রচুর লাকড়ির প্রয়োজন দেখা দিলে ওই লাকড়িগুলো কাজে লাগানো হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত প্রতি বছর ২৬শে শাওয়াল বিজয় দিবসে লাকড়ি তোড়া উৎসবের মাধ্যমে সংগ্রহীত লাকড়ি দিয়ে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ওরসের দিন শিরণী রান্নার জন্য চুলায় আগুন ধরানো হয়।

কথিত আছে, ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সিলেটে মহা ধুমধাম ও জাকজমকের সাথে সিলেটের বিজয় দিবস হিসেবে এই উৎসব পালন করা হতো। অতীতে এই অনুষ্ঠানে মেলা, প্রশাসনের ব্যান্ড দিয়ে কুচকাওয়াজ, বন বিভাগের হাতি অংশগ্রহণসহ বিশাল আয়োজন দেখা যেত। তবে বর্তমানে সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ থাকলেও সাধারণ ভক্ত ও ধর্মপ্রেমীরা প্রতিবারই উৎসব স্বচ্ছন্দভাবে পালন করে আসছেন। কালের বিবর্তনে সিলেটের ইসলাম বিজয়ের অনুষ্ঠানটি কেবল লাকড়ি ভাঙ্গার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ হযরত শাহজালাল (রহ.) ও ৩৬০ আউলিয়া ভক্তবৃন্দ পরিষদ‑এর সভাপতি সরেকওম ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, লাকড়ি তোড়া উৎসব শুধু কাঠ সংগ্রহ না‑ বরং হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবন দর্শন, সহমর্মিতা, ঐক্য‑ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা ও মানবিক বন্ধন প্রকাশের একটি মাধ্যম। প্রতিবারের মতো এবারও সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে লাকড়ি তোড়া মেলা অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তীতে বার্ষিক ওরসও অনুষ্ঠিত হবে। সারা দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ ভক্তবৃন্দ সিলেটে সমাগত হবেন। আমরা তাদের বরণে প্রস্তুত রয়েছি।

তিনি আরও বলেন, এই দিনটির প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। সিলেটে ইসলামের বিজয় দিবস পালন ও লাকড়ি তোড়া উৎসবে সকলকে সহযোগিতার জন্য উদাত্ত আহবান জানান তিনি।

সর্বশেষ - লিড নিউজ