রিটন আহমদ দিপু ::
দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন; এমন ৫/৬টি মোটাদাগের প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে যাত্রা করে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। গেল ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথগ্রহণ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হল। ব্যর্থতা-সফলতা নিয়ে নানামু্খি আলোচনা আছে। এসব নিয়েই এ প্রতিবেদন।
নতুন সরকারের এ ক’দিনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপন, প্রশাসনে সময়ানুবর্তিতা, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতাসাধন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার মতো উদ্যোগ এসেছে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমে স্থবিরতা, জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া ও রাজনৈতিক ছন্দপতন, পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারা- এসবও আছে আলোচনায়।
প্রথম ১০০ দিনে ২০০ উদ্যোগ ও প্রকল্প গ্রহণের কথা জানানো হয়। ৫ মাস পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরকারের কার্যক্রমকে ‘বহুমাত্রিক সাফল্য’ হিসেবে তুলে ধরে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে।
আলোচিত উদ্যোগের একটি ফ্যামিলি কার্ড। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত নিম্নআয়ের পরিবারকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হয়। ধাপে ধাপে দেশের ৪ কোটি পরিবারকে কর্মসূচির আওতায় আনার টার্গেট। প্রধানমন্ত্রী প্রকৃত উপকারভোগী চিহ্নিত করতে সঠিক ডাটাবেজ তৈরি করে ধাপে ধাপে কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের তাগিদ দিয়েছেন। কৃষক কার্ড, খাল খনন- পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, ক্রীড়া কার্ড, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সহায়তা-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খালখনন-পুনঃখননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিপুলসংখ্যক চারা উৎপাদন করা হয়েছে। প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রেও কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মন্ত্রী-এমপিদের বিশেষ সুবিধা কমানো, এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লটের সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রেও সরকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। একটি দেশে পাচার হওয়া সম্পদ জব্দের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমাতে নতুন গাড়ি কেনা, ভবন নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও বিদেশ সফরে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা; সরকার এটিকে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার বাজেট হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে বাজেট ঘিরে শুরু থেকেই বিরোধী দলগুলোর ‘সমালোচনা’ ছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এটিকে ‘দিক নির্দেশনাহীন’ ও জনগণের ‘প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ’ বলে মন্তব্য করেছে।
১০০ দিন নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ- ‘‘দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা পদত্যাগের পর নতুন কমিশন গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে তদন্ত, মামলা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যক্রমে স্থবিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়।’’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে টানাপোড়েন বিদ্যমান। বিরোধী জোটের অভিযোগ, সংস্কারের মূল চেতনা থেকে সরকার সরে যাচ্ছে। আর সরকার বলছে, জুলাই সনদ ও বিএনপির ৩১ দফার ভিত্তিতেই সংস্কার এগোবে।
ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া বিপর্যস্ত আইনশৃঙ্খলা নিয়েও স্বস্তি ফেরেনি। তবে সরকার যাত্রার শুরুতেই মব সংস্কৃতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে। জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে ১০ হাজার পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ৪ জেলায় ১৯টি আসনের ১৮টিতেই বিএনপি প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। সিলেট-৬ আসনে ৩০ বছর পর বিএনপি জয় এসেছে। এসব কারণে সিলেটের প্রতি সরকারপ্রধানের ‘সুদৃষ্টি’ রয়েছে। ৬ মাসে সেই দৃষ্টির প্রতিফলনও ঘটছে।
২ মে প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফর দিয়ে নাগরিক প্রত্যাশায় যোগ হয় নতুন মাত্রা। সুরমা নদীর দুই তীরে জলাবদ্ধতা ও বন্যা মোকাবিলায় বড় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর, বাসিয়া নদী পুনঃখনন এবং নতুনকুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন করে যান তিনি। যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, পানি, বন্যা প্রতিরক্ষা ও নগর উন্নয়ন নিয়ে গুচ্ছ পরিকল্পনার কথাও জানান সেদিন।
জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প, সুরমার দুই পাড়ে বন্যা প্রতিরক্ষা ও ওয়াকওয়ে, বাসিয়া নদীর ২৩ কিলোমিটার পুনঃখনন, সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ডাবল লাইন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের উন্নয়ন এবং ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালুর মতো পরিকল্পনা আশা জাগানিয়া।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে সিলেটে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে। প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরে তার প্রমাণ মিলেছে। প্রধানমন্ত্রীই আমাদের অভিভাবক।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও এমরান আহমদ চৌধুরী এমপি সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, জটিল রোগের চিকিৎসায় সরকারি সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে এবং পথশিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিলেট উন্নয়ন কমিটি (এসডিএ) সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর মতে, গত দেড় দশকের প্রত্যাশিত উন্নয়ন এবার সিলেটবাসী পাওয়ার আশা করছেন। আমরাও আশাবাদী সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় টেকসই উন্নয়ন হবে।
অন্যদিকে সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির ও কেন্দ্রীয় সদস্য মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন- বিএনপি সরকার শুধু জুলাই সনদ নয়, তাদের নিজেদের ৩১ দফা প্রতিশ্রুতিও উপেক্ষা করছে। দেশে একদলীয় শাসনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ই ইউ শহীদুল ইসলাম শাহীনও বলেন, সারাদেশের তুলনায় সিলেট উন্নয়নে পিছিয়ে আছে এবং ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার প্রত্যাশা, সিলেটের দুই মন্ত্রী স্থানীয়ভাবে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন।




















