রিটন আহমদ দিপু : :
দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সিলেটে শুরু হয়েছে অঘোষিত ভাড়া বৃদ্ধি। নির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়লেও কার্যকর নজরদারির অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সিলেট নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া নিয়ে তৈরি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। এ যেনো এক ‘নিরব নৈরাজ্য’।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট-আম্বরখানা, কদমতলী, বন্দরবাজার ও শিবগঞ্জ এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের সরকারি ঘোষণা ছাড়াই পরিবহন শ্রমিকরা নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন। এতে করে প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
আম্বরখানা এলাকায় কথা হয় অফিসগামী যাত্রী নাজমুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন একই রুটে চলাচল করি। কিন্তু গত দুই দিন ধরে ১০-১৫ টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে বলা হয়-তেল বেড়েছে, ভাড়া বাড়বে।’
কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘পরীক্ষার সময় নিয়মিত যাতায়াত করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রতিদিন বাড়তি ভাড়া দেওয়াটা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দৈনিক পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকায় পৌঁছানোর ফলে প্রতিটি ট্রিপে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার একাধিক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘শুধু জ্বালানি নয়, যন্ত্রাংশ, টায়ার, লুব্রিকেন্ট-সবকিছুর দাম বেড়েছে। আগের ভাড়ায় গাড়ি চালানো সম্ভব না। সরকার ভাড়া নির্ধারণ না করলে এভাবে চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।’
তবে যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, এই সুযোগে অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। তাদের মতে, ২০২২ সালে জ্বালানির দাম বেশি বাড়লেও ভাড়া বৃদ্ধি ছিল সীমিত। কিন্তু এবার তুলনামূলক কম দাম বাড়লেও ভাড়া বৃদ্ধির দাবি অস্বাভাবিক।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, ভাড়া বাড়ানোর আগে সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। সিলেটে এখনো অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, ভাঙা বাস ও অনিয়মিত সার্ভিস সাধারণ চিত্র। এসব ঠিক না করে শুধু ভাড়া বাড়ানো অন্যায্য।
এদিকে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সিলেট কার্যালয়সূত্রে জানা গেছে, এখনো নতুন ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ভাড়া নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা আইনত দণ্ডনীয়।
তবুও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নগরজুড়ে তদারকি না থাকায় পরিবহন শ্রমিকরা সুযোগ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত ভাড়া নির্ধারণের পাশাপাশি কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এতে শুধু পরিবহন খাত নয়, নিত্যপণ্যের দামসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে সিলেটের সাধারণ মানুষের একটাই দাবি-ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে কঠোর ব্যবস্থা। অন্যথায় জ্বালানির দামের প্রভাব আরও গভীর সংকটে ফেলতে পারে পুরো অঞ্চলের জনজীবন।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি রোটারিয়ান এম ইকবাল হোসেন বলেছেন, “দু’দিন পরপর গাড়িভাড়া বাড়িয়ে যাত্রী হয়রানি কাম্য নয়।” তিনি বলেন, গণপরিবহনে অস্থির ভাড়ার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। ভাড়া নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত না হলে সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হবেন।




















