Ekattorer Kotha
মঙ্গলবার , ৪ আগস্ট ২০২৬ | ৯ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১১ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আলোচিত
  5. ক্রিকেট
  6. খুলনা
  7. খেলা
  8. চট্রগ্রাম
  9. জাতীয়
  10. ঢাকা
  11. দেশের ভেতরে
  12. প্রবাসের কথা
  13. প্রযুক্তি
  14. প্রেসবক্স
  15. ফিচার

রক্তস্রোতে ভেসে গেছে ফ্যাসিবাদ

# গোলাপগঞ্জে ছয় প্রাণের পরও থামেনি আন্দোলন # সিলেট নগর থেকে ঢাকামুখী জনস্রোত # দুপুরেই বদলে যায় দেশের রাজনীতির গতিপথ

                       

আগস্ট ৪, ২০২৬
                   

রিটন আহমদ দিপু : :

এক দিন আগে গোলাপগঞ্জের রাজপথে ঝরেছিল ছয় প্রাণ। গুলির শব্দে ভারী হয়েছিল সিলেটের আকাশ, স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়েছিল অসংখ্য ঘর। কিন্তু সেই রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই ৫ আগস্ট সকালে আবারও রাজপথে নামে মানুষ। সিলেট নগর থেকে গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকার দিকে এগোতে থাকে জনতার স্রোত।

সিলেটের রক্তাক্ত প্রতিরোধ আর ঢাকার গণজোয়ার-দুই প্রান্তের এই জনঅভ্যুত্থানের মধ্যেই দুপুরে ঘটে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক পরিবর্তন। পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।

জুলাই আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সিলেট ছিল অন্যতম উত্তপ্ত অঞ্চল। ৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে নিহত হন ছয়জন। ঢাকাদক্ষিণ, গোলাপগঞ্জ পৌরসদর ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে গুলিবিদ্ধ হন বহু মানুষ। নিহতদের মধ্যে ছিলেন নাজমুল ইসলাম, হাসান আহমদ জয়, সানি আহমদ, তাজ উদ্দিন, মিনহাজ আহমদ ও গৌছ উদ্দিন।

পরদিন ৫ আগস্টও শান্ত হয়নি সিলেট। সরকার পতনের দাবিতে নগরীতে মিছিল ও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের খবর আসে। গুলিতে নিহত হন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক পঙ্কজ কুমার কর ও পাবেল আহমদ কামরুল। বিয়ানীবাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।

পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সিলেটে আন্দোলনকে ঘিরে ২৬ জন নিহত হন। ফলে ৫ আগস্ট সিলেটের মানুষের কাছে ছিল একই সঙ্গে বিজয় ও শোকের দিন।

সিলেটের আন্দোলনের বড় কেন্দ্র ছিল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। পরে আন্দোলনে যুক্ত হন সাধারণ মানুষও।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ একের পর এক মৃত্যুর পর দ্রুত বদলে যায়। নিহতদের বিচার, হামলা-নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং সরকারের পদত্যাগের দাবি সামনে আসে।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা এবং ৪ আগস্ট সর্বাত্মক অসহযোগের পর ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি আন্দোলনকে নিয়ে যায় চূড়ান্ত পর্যায়ে।

৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কারফিউ উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে মানুষ এগিয়ে আসেন ঢাকার কেন্দ্রের দিকে। শাহবাগ, ফার্মগেট, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয় জনসমুদ্র।

একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা গণভবনের দিকে অগ্রসর হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। দুপুরের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। বিকেলে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণে তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর গণভবনে প্রবেশ করে জনতা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শুরু হয় বিজয় মিছিল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা মুহূর্তেই পাল্টে যায়।

৫ আগস্টের পেছনে ছিল পুরো জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত আন্দোলন। ঢাকা ছাড়াও সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

৪ আগস্টই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানি ঘটে। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হন। ফেনী, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, মাগুরা, মুন্সিগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ, ভোলা, পাবনা, জয়পুরহাট, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ৫ আগস্ট। ঢাকামুখী মানুষের ঢল আর সারাদেশের রাজপথের আন্দোলন একসঙ্গে মিলে তৈরি করে নজিরবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে ঢাকার পাশাপাশি সিলেটের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে নগরীর রাজপথ, এরপর গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় ব্যাপক জনসম্পৃক্ত আন্দোলনে।

বিশেষ করে ৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জের ছয়জনের মৃত্যু সিলেটের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। পরদিনও যখন রাজপথে মানুষ ছিল, তখন ঢাকায় সরকার পতনের খবর আসে। একদিকে সিলেটে স্বজন হারানোর কান্না, অন্যদিকে রাজপথে বিজয়ের মিছিল-৫ আগস্টের সিলেটের ইতিহাসে এই দুই বিপরীত চিত্র পাশাপাশি থেকে গেছে।

কোটা সংস্কারের দাবি দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রূপ নেয় সরকার পতনের গণআন্দোলনে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের পরবর্তী অনুসন্ধানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়।

এই বিপুল প্রাণহানির প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের গল্প। সিলেটের ২৬ জন নিহতের হিসাবও কেবল একটি সংখ্যা নয়-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২৬টি পরিবার, অসংখ্য স্বজনের কান্না এবং বহু অসমাপ্ত স্বপ্ন।

৫ আগস্ট তাই শুধু শেখ হাসিনার পদত্যাগ কিংবা একটি সরকারের পতনের দিন নয়। এটি সেই দিন, যেদিন সিলেটের রক্তাক্ত রাজপথ, ঢাকার জনস্রোত এবং সারাদেশের প্রতিরোধ যেনো এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল।

এক দিন আগে গোলাপগঞ্জে যে রক্ত ঝরেছিল, ৫ আগস্ট সেই রক্তের ওপর দিয়েই বাংলাদেশ পা রাখে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে।

সর্বশেষ - লিড নিউজ