রিটন আহমদ দিপু ::
সিলেট নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি নিরসনে বড় পদক্ষেপ হিসেবে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার বেলা ১১টায় নগরীর চাঁদনীঘাট এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি। এ সময় তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ জনগণের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে সকাল থেকেই সিলেটজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন। এর আগে সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তাকে বহনকারী উড়োজাহাজ সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এ অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম সিলেট সফর, যা রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত-দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ সিলেটে তার শ্বশুরবাড়ি রয়েছে।
বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সিলেট নগরীর চাঁদনীঘাট এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘সিলেট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। প্রবাসী আয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের জন্য এই অঞ্চল বিশেষভাবে পরিচিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, বছরের পর বছর ধরে এই নগরী বন্যা ও জলাবদ্ধতার সমস্যায় ভুগছে। আজ আমরা যে মেগা প্রকল্প উদ্বোধন করছি, এটি বাস্তবায়ন হলে সিলেটে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, সিলেটের ভৌগোলিক অবস্থান ও অতিবৃষ্টির কারণে প্রতি বছর নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার শিকার হতে হয়, যা শুধু দৈনন্দিন জীবনযাত্রাই ব্যাহত করে না, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে এই মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক ও কার্যকর হবে, খাল-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসবে এবং জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে কমে আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগর উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘নদীতে প্লাস্টিকের স্তর জমে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।’ তিনি মনে করেন, নদী ও খাল দখল, দূষণ এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন এলাকার স্কুলগুলোতে শিশুদের পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে হবে।’ তার মতে, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব আচরণ গড়ে তুলতে পারলে তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না, বরং নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সিলেটকে একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘চার হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, এটি সিলেটের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি স্থাপন করবে। আমরা এমন একটি আধুনিক নগর গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষ স্বস্তিতে বসবাস করতে পারবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমে আসবে।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বন্যা ও জলাবদ্ধতা কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এর সমাধানও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত হবে, নদী ও খালগুলোর প্রবাহ সচল থাকবে এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক করা হবে।’
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই প্রকল্প যেন সময়মতো এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সে বিষয়ে সবাইকে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রকল্পের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাদের শক্তি। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। নগরীর খাল-নদী দখল ও দূষণ থেকে রক্ষা করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেটের উন্নয়ন মানে শুধু একটি শহরের উন্নয়ন নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করা। আমরা চাই, সিলেট একটি আধুনিক, পরিকল্পিত এবং পরিবেশবান্ধব নগরীতে পরিণত হোক।’
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শেষ দিকে বলেন, ‘আমি আশাবাদী, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেটবাসীর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে। আমরা জনগণের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব-উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিলেট নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা অনেকাংশে লাঘব হবে এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। একইসঙ্গে নগর অবকাঠামো উন্নয়নে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।




















