আব্বাকে হারিয়েছি আজ দীর্ঘ ১১ বছর হয়ে গেলো । কত লম্বা একটা সময় চলে গেছে আব্বাকে ছাড়া। কীভাবে যে আব্বা ছাড়া এই সময় কাটিয়ে দিলাম চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। এটি বিশ্বাস করি আমাদের উপর আব্বার প্রচন্ড রকমের দোয়া আছে সেজন্যই আমরা আমাদের মতো করে পথ চলা শিখেছি পৃথিবীর পথে। অসম্ভব দোয়া করতেন আমাদের জন্য। নাম ধরে ধরে দোয়া করতেন। এই দোয়া যে আমাদের উপর আজীবন বহাল থাকে সেটি আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।
একজীবনে মানুষ কী পরিমাণ ধৈর্যশীল আর উদারপন্থী মানসিকতার হওয়া যায় তা আব্বাকে দেখে উপলব্ধি করেছি। মানুষকে ভালোবাসতেন, অসম্ভব রকমের। ছোট-বড় সবাইকে আগেভাগেই সালাম দিতেন। শিক্ষিত মানুষজনকে অসম্ভব কদর করতেন। চোখের সামনে দেখলাম আমাদের আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে সমাজের কত প্রোগ্রামাদি সফল করতে কি পরিমাণ নিরলস পরিশ্রম করতেন। আমাদের শেখাতেন কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। শিখিয়ে গেছেন হাত ধরে বহুকিছু।
বন্দর বাজারের আশানিতার আখনি হাউজের সামনে গেলেই আব্বাকে মনে হয়। বিরিয়ানির প্যাকেট কত যত্ন করে নিতেন আমাদের জন্য। কোন কোন সময় এরকম হয়েছে স্কুলে নিয়ে যেতেন খাবারের প্যাকেট। বাইরে খেতে নিয়ে বের হতেন আমাদের তিনজনকেই। আমরা তিন ভাই শপিং করতাম আব্বাকে নিয়েই। খেলা পাগল ছিলাম বলে, মাঝেমধ্যে স্টেডিয়াম দেখাতে নিয়ে আসতেন। খালি স্টেডিয়ামে আব্বাকে রেখেই দৌড় দিতাম মাঠে, আর ভাবতাম এতো বিশাল মাঠে প্লেয়াররা ছক্কা মারেই বা কীভাবে। আমাদেরকে নিয়ে যখন ঘুরতে বের হতেন, তখন প্রতিটি স্থানের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। এজন্যই বহুকিছুর সাথেই আমরা বহু আগে থেকেই পরিচিত। আব্বা ছিলেন আমাদের মহান শিক্ষক।
আমাদের এক বোন জামাই এখনো উনি আমাদেরকে পেলে বলেন, তোমাদেরকে আমি আমার স্ত্রীর সম্পর্কের চোখে দেখি না, আমি তোমাদেরকে আমার ভাই মনে করি। কারণ মামার একক সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের বিয়েটা সুন্দরভাবে হয়। নতুবা বিয়েটা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম ছিলো দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন মত থাকায়। মামা সেদিন মোটামুটি দায়িত্ব নিয়েই বিয়েটি সম্পন্ন করিয়েছিলেন। এরকম দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন তিনি।
কত স্মৃতি আমাদের আব্বাকে নিয়ে। একদিন এক চাচা আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে ধুম কান্না। আমি কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। উনিই বললেন, যখন আমাকে কেউ ঠাঁই দিচ্ছিলোনা একটি বিষয় নিয়ে, তখন তোমার বাবা একমাত্র এই একজন মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলো। বহুজনের বিরুদ্ধে এমনকি নিজের অনেকের বিরুদ্ধে গিয়েও আমার কাছে ছিলো এই মানুষটি। এই মানুষ আমি আর পাবোনা।
শেষ সময়ে এসে যখন আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন আমাদেরকে বুঝতে দিতেন না তিনি যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রচন্ড চিন্তা করতেন আমাদেরকে নিয়ে। সুঠাম দেহের অধিকারী আমার বাবা হঠাৎ এক রাতে স্ট্রোক করলেন। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আব্বার স্ট্রোক করার দিনই আমি বুঝে নিয়েছিলাম, পৃথিবী আমাদের জন্য কঠিন হয়ে আসতেছে। হয়েছিলোও তাই। প্রচুর সংকট খুব কাছ থেকে দেখে আসা মানুষ আমরা। আব্বা চলে গেলেন নিরবে, নিভৃতে। আমরা হয়ে পড়লাম জনমের মতো অসহায়। কি করবো কি না, আমাদের কিছুই জানা ছিলোনা। তারপরেও সেই সংকটকালীন মুহূর্তে যেসকল ভালো মানুষজন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আমরা আপনাদেরকে কখনোই ভুলবোনা। আপনাদের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ।
গত ১০ই মে আমার বিবাহ প্রোগ্রাম খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে শেষ হলো। আম্মা শুধু বারবার বলছিলেন তর আব্বা থাকলে, তারেক-রুবেল দেশে থাকলে এরকম ছোট পরিসরে বিয়ে কোন অবস্থায়ই হতোনা। আমিও জানি আব্বা থাকলে আমাদের অনেককিছুই ভিন্ন হতো। সবই মহান রবের সিদ্ধান্ত।
লম্বা এই সময় পেরিয়ে এসেও আব্বার বহু স্মৃতি আমাদের মানসপটে চির অম্লান হয়ে আছে,আজীবন থাকবে। আল্লাহ আপনাকে সবসময় ভালো রাখুন, দান করুন জান্নাতুল ফেরদাউস, আমিন ইয়া রব।




















