রিটন আহমদ দিপু
ক্রীড়াবিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসবের অপেক্ষা শেষ হতে চলেছে। আর মাত্র ৭ দিন পরই শুরু হচ্ছে ফুটবলের মহাযজ্ঞের বিশ্বকাপ। কোটি কোটি সমর্থকের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বিশ্বজুড়ে উৎসবের আবহ। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি বিশ্লেষণ, সম্ভাবনা, তারকাদের পারফরম্যান্স, নতুন ছক, দর্শক উন্মাদনা, সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্ব এখন যেন এক বিশাল অপেক্ষার নাম। এবারই প্রথম তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ, আর প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, দীর্ঘ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বকাপের সাক্ষী হতে যাচ্ছে পৃথিবী।
আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এই মহারণ। আয়োজক দেশ হিসেবে রয়েছে কানাডা, মেঙ্েিকা ও যুক্তরাষ্ট্র। মোট ১৬টি নগরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি অঞ্চলের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম যেখানে তিনটি দেশ একসঙ্গে আয়োজক হয়েছে, যা ফুটবল আয়োজনের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের এবারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে প্রতিযোগিতার কাঠামোয়। আগের ৩২ দলের বদলে এবার অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। দলগুলোকে ভাগ করা হবে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্ব শেষে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও নকআউট পর্বে জায়গা পাবে। ফলে রাউন্ড অব ৩২ দিয়ে শুরু হবে সরাসরি বাদ পড়ার লড়াই। এতে ম্যাচ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশ্বকাপের এই সম্প্রসারণে সুযোগ পেয়েছে আরও বেশি দেশ। এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব আগের চেয়ে বেড়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এতে বিশ্বকাপ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে, একইসঙ্গে বেড়েছে অঘটনের সম্ভাবনাও। আগে যেসব দল কেবল দর্শক হয়ে থাকত, এবার তারা বড় শক্তিগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে প্রস্তুত।
শিরোপা দৌঁড়ে বরাবরের মতো আলোচনায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, ইউরোপীয় শক্তি ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও পর্তুগাল। একইসঙ্গে তরুণ তারকাদের উত্থান এবারের বিশ্বকাপকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। একদিকে অভিজ্ঞদের শেষ মিশন, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণের লড়াই-দুইয়ের মিশেলে ফুটবল অনুরাগীদের সামনে অপেক্ষা করছে বৈচিত্র্যময় প্রতিযোগিতা।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি, পর্তুগালের কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হতে পারে এক আবেগঘন অধ্যায়। মেসি ও রোনালদোর জন্য এটি ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, আর নেইমারের জন্য চতুর্থ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য শিরোপা, রেকর্ড ও ইতিহাস গড়লেও বিশ্বমঞ্চে শেষবারের মতো নিজেদের জাদু দেখানোর সম্ভাবনায় বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে অন্যরকম আগ্রহ। কোটি সমর্থকের প্রশ্ন এ কি তবে কিংবদন্তিদের শেষ বিশ্বকাপ?
অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে আলো ছড়াতে প্রস্তুত ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। আগের আসরে গোল্ডেন বুট জয়ের পর এবার তৃতীয় বিশ্বকাপে নামছেন তিনি, এবং অনেকের চোখে তিনিই অন্যতম শিরোপা-নির্ধারক ফুটবলার। তার সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন ব্রাজিলের ভিনিসিয়াস জুনিয়র, স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল, ইংল্যান্ডের মিডফিল্ড সেনসেশন জুড বেলিংহ্যাম এবং নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। তরুণদের এই শক্তিশালী উপস্থিতি এবারের বিশ্বকাপকে করে তুলেছে আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত।
বিশ্বকাপ মানেই চমকের গল্প। অতীত বলছে, বড় শক্তির বাইরে থেকেও কোনো না কোনো দল উঠে আসে আলোচনার কেন্দ্রে। গত আসরে আফ্রিকার প্রতিনিধি মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় বিস্ময়। এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। জাপান, নরওয়ে ও কানাডাকে সম্ভাব্য ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা কয়েকটি দেশের দিকেও বাড়তি নজর রয়েছে। নতুন দলগুলোর অংশগ্রহণে বিশ্বকাপের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে নতুন গল্প জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনাও।
বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সবখানেই চলছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিতর্ক, প্রিয় দলের সম্ভাবনা নিয়ে হিসাব-নিকাশ এবং রাতজাগা খেলা দেখার প্রস্তুতি। বাসাবাড়ির ছাদে ছাদে উড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। ফুটবল যেন আবারও মানুষকে একত্রিত করার সবচেয়ে বড় উপলক্ষ হয়ে উঠছে। শহর থেকে গ্রাম-চায়ের দোকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আড্ডা কিংবা খেলার মাঠ। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থকদের ঐতিহ্যগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইউরোপীয় দলগুলোর শক্তি নিয়ে আলোচনা এবং রাতজাগা ম্যাচ দেখার প্রস্তুতি ইতোমধ্যে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন, বাড়তি দল, দীর্ঘ সূচি ও ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আরেকটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি হতে যাচ্ছে ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। কোটি মানুষের আবেগ, জাতীয় গৌরব ও বিশ্বব্যাপী উৎসবের সম্মিলনে আবারও প্রমাণ হবে, ফুটবল কেবল খেলা নয়, এটি বিশ্বজনীন অনুভূতির নাম।


















