একাত্তর ডেস্ক
মাত্র চার বছর বয়সে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে অসহায় অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল ছোট্ট এক শিশুকে। নিজের নামটুকুও স্পষ্ট করে বলতে পারত না সে। কোথা থেকে এসেছে, কার মেয়ে কিছুই জানা ছিল না কারও। ভয় আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা সেই শিশুটিই আজ নতুন জীবনের পথে পা রাখল।
বুধবার দুপুরে সিলেটের শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন স্বপ্না আক্তার। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠল তার নতুন জীবনের সূচনার সাক্ষী।
বিয়ের আয়োজনজুড়ে ছিল আবেগ, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের অনন্য প্রকাশ। সাজসজ্জা থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন ও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা- সবকিছুই ছিল একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ের বিয়ের মতো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, উদ্ধার করার পর স্বপ্নাকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় দেওয়া হয়। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ফলে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া চালিয়ে গিয়ে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মোক্তার হোসেন জানান, ‘স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। তার কোনো অভিভাবক না থাকায় এবং তার সম্মতি নিয়েই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। আমরা চেয়েছি, তার ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও সুন্দর হয়।’
পাত্রও সিলেটের বাসিন্দা। তিনি ইলেকট্রিকের ঠিকাদারি কাজ করেন। বিয়ের আয়োজনকে ঘিরে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে আসেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও বিশিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা স্বপ্নার নামে এফডিআর করা হবে। স্থানীয় এক ব্যক্তি প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উপহার দিয়েছেন। পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। এছাড়া একটি মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উপহার হিসেবে দেয় ১০০ কাপ দই।
সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন ছিল আনন্দঘন ও হৃদয়স্পর্শী। দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এটি পরিবারহীন এক তরুণীর বিয়ে। বরং মনে হচ্ছিল, অনেক আদরে বড় হওয়া কোনো মেয়ের বিয়ের আয়োজন চলছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায়, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি পিতৃমাতৃহীন শিশুকে আশ্রয়ই দেয়নি, তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ তাকে বিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের ভিত্তিও তৈরি করে দিল।’
তিনি নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবন কামনা করেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশু, ঝুঁকিতে থাকা ও পিতৃহীন শিশুদের আশ্রয়, ভরণপোষণ ও পুনর্বাসন সেবা দিয়ে আসছে। স্বপ্না আক্তারের জীবনগাথা সেই মানবিক উদ্যোগেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।




















