Ekattorer Kotha
রবিবার , ২৮ জুন ২০২৬ | ৩০শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আলোচিত
  5. ইপেপার
  6. ক্রিকেট
  7. খুলনা
  8. খেলা
  9. চট্রগ্রাম
  10. জাতীয়
  11. ঢাকা
  12. দেশের ভেতরে
  13. প্রবাসের কথা
  14. প্রযুক্তি
  15. প্রেসবক্স

সিলেটে যন্ত্রণার আরেক নাম ট্রাক

মুক্তি চায় নগরবাসী

                       

জুন ২৮, ২০২৬
                   

রিটন আহমদ দিপু ::

ভোর থেকে রাত অবধি সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে যখন কর্মজীবী মানুষেরা ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেয়, ঠিক তখনই সিলেট নগরীর বিভিন্ন সড়ক চলে যায় ভারী যানবাহনের দখলে। রাত ১০টা বাজতেই নগরীর প্রবেশপথ দিয়ে শত শত ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহন নগরীতে প্রবেশ করতে শুরু করে। মুহূর্তেই তৈরি হয় তীব্র যানজট। বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, চরম ভোগান্তিতে পড়েন বাড়িফেরার পথে থাকা মানুষজন। অভিযোগ রয়েছে, বছরের পর বছর ধরে এমন পরিস্থিতি চলে আসছে। তবে এটা থেকে উত্তরণে বা বিকল্প কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের দাবি ট্রাক প্রবেশের সময়সীমা পরিবর্তন করে পিছিয়ে দেয়া উচিত। ভুক্তভোগী লোকজন বলছেন, ট্রাক প্রবেশের সময়সীমা অন্তত ১/২ ঘণ্টা পিছিয়ে দিলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অনেকটাই সমাধান সম্ভব। তবে এটা নিয়ে দায়িত্বশীলদের চিন্তাভাবনা বা পরিকল্পনা না থাকায় ভোগান্তি কমছেই না। তবে এ বিষয়ে সম্প্রতি এক বক্তব্যে আশার বাণী শুনিয়েছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তিনি জানিয়েছেন, সিলেটে ট্রাক চলাচলের জন্য সরকার বিকল্প সড়কের কাজ চালাচ্ছে। এরআগে ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের জন্য বিকল্প সড়ক নির্মাণ নিয়ে সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও ছিলেন বেশ সরব।

গত কয়েকমাস ধরে সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিদিন রাত ১০টার পর তামাবিল সড়ক, সুনামগঞ্জ সড়ক, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হয়ে নগরীতে প্রবেশ করে অসংখ্য পণ্যবাহী ট্রাক। আম্বরখানা, বন্দরবাজার, সোবহানিঘাট, উপশহর মেন্দিবাগ পয়েন্ট, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, হুমায়ূন চত্বর, কোর্টপয়েন্ট, চৌহাট্টা, লামাবাজার, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

দেখা গেছে, যেখানে দিনের ব্যস্ততা শেষে মানুষের দ্রুত ঘরে ফেরার কথা, সেখানে অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে।

যানজটে আটকে থাকা সাধারণ মানুষদের সাথে কথা বললে তাদের দাবি, ভারী যানবাহনের কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। রাতের অন্ধকারে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করা ট্রাক অনেক সময় পথচারী ও ছোট যানবাহনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট নগরীর অধিকাংশ সড়ক ভারী পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘমেয়াদি চাপ বহনের উপযোগী করে নির্মিত হয়নি। অথচ প্রতিদিন শত শত অতিরিক্ত ওজনের ট্রাক নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করায় দ্রুত নষ্ট হচ্ছে সড়কের কার্পেটিং, সৃষ্টি হচ্ছে গর্ত ও খানাখন্দ। ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকাতে রাস্তাগুলো মারাত্মকভাবে ভাঙাচোরা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে আম্বরখানা, বন্দরবাজার, কুমারপাড়া, লামাবাজার, মদিনা মার্কেট, সুবিদবাজার, দক্ষিণ সুরমা ও শহরতলির বিভিন্ন সড়কে ট্রাক চলাচলের কারণে রাস্তার স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে এসব ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে পানি জমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

অন্যদিকে ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। মোটরসাইকেল আরোহী, রিকশাচালক, সিএনজি অটোরিকশা যাত্রী এবং পথচারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

বন্দরবাজারস্থ রিকশাচালক আবদুল মালেক মিয়া বলেন, “রাত ১০টার পর রাস্তায় নামলে ভয় লাগে। ট্রাকগুলো এত দ্রুত চলে যে কখন কী হয় বলা যায় না। অনেক সময় যাত্রী নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েও আতঙ্কে থাকতে হয়।”

বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “সারাদিন অফিস শেষে পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। কিন্তু প্রায়ই রাত ১০টার পর ট্রাকের কারণে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হয়। প্রশাসন বিষয়টি দেখছে কি না সেটাই বুঝতে পারছি না।”

ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, “ট্রাক আসবে, পণ্য পরিবহন হবে-এটা প্রয়োজন। কিন্তু নগরবাসীর জীবনকে জিম্মি করে নয়। নির্দিষ্ট সময় ও বিকল্প ব্যবস্থা থাকা উচিত।”

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, নগরীতে ট্রাক প্রবেশের সময়সূচি, রুট ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প ট্রাক টার্মিনাল নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই কম। নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সিলেট দ্রুত বর্ধনশীল নগরী। পরিকল্পনাহীনভাবে ভারী যানবাহন প্রবেশ করলে যানজট ও দুর্ঘটনা অনিবার্য। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিবহন পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

গবেষক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন বলেন, ‘‘প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নয়, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও। প্রতিদিন মানুষ যদি একই সমস্যায় ভোগে, তাহলে সেটি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।’’

সাবেক সরকারি কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, “নগরীর বাইরে বিকল্প ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রবেশ নিষিদ্ধকরণ এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সংকট দূর হবে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরীর বাইরে আধুনিক ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ, পণ্য খালাসের জন্য নির্দিষ্ট জোন নির্ধারণ, ভারী যানবাহনের বিকল্প রুট চালু এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। একই সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সর্বশেষ - ইপেপার

আপনার জন্য নির্বাচিত