মিসবাহ উদ্দীন আহমদ
আগামী ২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেট সফরে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণের পর সিলেটে এটিই তার প্রথম সফর। সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় তারেক রহমানের শ্বশুরবাড়ি; আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কারণে সিলেটে তার আলাদা কদর। সিলেটকেও বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন ‘সিলেটের জামাই’।
দেশে ফেরার পর নির্বাচনের আগে যেদিন সিলেটে এসেছিলেন সেদিনই তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। আপোসহীন নেত্রী ও দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এমনটি করতেন। সিলেটে পৌঁছেই ওলি-আউলিয়াদের মাজার জিয়ারত করতেন। বড়ছেলে তারেক রহমান মায়ের রেওয়াজ ভুলেননি নির্বাচনের আগে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সিলেটে প্রথম সফরকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ দলীয় প্রধানের সফরকে সফল করে তুলতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী যেসব স্থানে যাবেন তারাও সেসব এলাকার প্রস্তুতি তদারকি করছেন। বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোটা নগরজুড়েই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও সৌন্দর্য্যবর্ধন করা হচ্ছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনী ও সংস্থাগুলোও তাদের কাজ চালাচ্ছেন।
সিলেট জেলা প্রশাসন ও বিএনপিদলীয়সূত্রে জানা গেছে, ২ মে দিনব্যাপী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান একাধিক আয়োজনে অংশগ্রহণ করবেন। নগরীর রিকাবীবাজারের জেলা স্টেডিয়াম থেকে সারাদেশব্যাপী শিশু-কিশোরদের মধ্যে থেকে প্রতিভা অন্বেষণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করবে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’। এটি উদ্বোধন করবেন তারেক রহমান। শহরতলীর কান্দিগাঁও এলাকায় বাসিয়া খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। সুরমা নদী সংলগ্ন চাঁদনীঘাটে সুরমার দুই তীর ঘিরে একটি মেগা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। এছাড়াও দিনের শেষে তিনি নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সিলেট বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়েও সভায় মিলিত হবেন।
সুরমা নদী ঘিরে কাজ শুরু হচ্ছে মেগা প্রকল্পের
সিলেট নগরকে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সুরমা নদীর দুই তীরজুড়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)। প্রকল্পটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার ক্বিনব্রিজ সংলগ্ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে এ প্রতিবেদককে এমন তথ্য জানিয়েছেন সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
সিলেট নগরভবন সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় নদীর দুই তীরে শক্তিশালী বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি আধুনিক ওয়াকওয়ে, স্লুইস গেট স্থাপন, নদীতীর সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এতে একদিকে নগরবাসীর জন্য নান্দনিক পরিবেশ তৈরি হবে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সুরমা নদীকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়ন নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। একই সঙ্গে নাগরিকরা পাবেন একটি আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নদীতীর। মৃতপ্রায় সুরমা নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে খনন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাক নদ থেকে উৎপত্তিস্থল জকিগঞ্জের আমলসীদ থেকে সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জের মারকুলি পর্যন্ত খনন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এতে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর নাব্যতা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যারও সমাধান মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২ মে সিলেট সফরে এসে এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তাঁর প্রথম সিলেট সফর। আমরা তাঁর আগমনকে স্বাগত জানাই এবং সফর সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সুরমা নদী ঘিরে এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সিলেট নগরের সামগ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরের পূর্ণসূচি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিলেট সফরের পূর্ণাঙ্গ সূচি প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার-১ মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সূচি অনুযায়ী সকাল ১০টায় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সাড়ে ১০টায় তিনি হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন।
বেলা ১১টায় চাঁদনীঘাট এলাকায় সিলেট নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের গৃহীত প্রকল্পের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে তাঁর। বেলা ১২টায় সদর উপজেলার কান্দিগাঁওয়ে বাসিয়া খাল (বাসিয়া নদী) খনন প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন তিনি। বিকেল ৩টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে বিকেল ৫টায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় সভায় অংশ নেবেন তিনি। সফরসূচি অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৭টায় সিলেট থেকে ঢাকার উদ্দেশে বিমানযোগে রওয়ানা করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
নগরভবনে প্রস্তুতি সভা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিলেট সফর ও সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া খাল খনন কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে রোববার সন্ধ্যায় নগরভবন সভাকক্ষে এক প্রস্তুতি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সিটি প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সভায় কান্দিগাঁওসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় লোকজন অংশগ্রহণ করেন।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, খাল-নদী খনন শুধু কৃষি উন্নয়নের জন্য নয়; এটি জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনা ও জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে এই ধরনের কর্মসূচির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন বিএনপির অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, এবং সেই ধারাবাহিকতায় তিনি সিলেট সফরে আসছেন। তাঁর এই সফর সফল করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। খাল খনন কর্মসূচি ও জনসভা সফল করতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন এবং দায়িত্বশীলভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।
সিলেটে বিএনপির সমাবেশ ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে আগামী ২ মে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিতব্য সিলেট বিএনপির দলীয় সভা সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে জেলা ও মহানগর বিএনপি। সোমবার বিকেলে নগরীর মেন্দিবাগ এলাকার একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি সভায় আয়োজনের সার্বিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়।
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এমপি ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর যৌথ পরিচালনায় সভায় সভাপতিত্ব করেন সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, রাজনীতি তখনই অর্থবহ হয় যখন তা মানুষের পাশে দাঁড়ায়। আসন্ন সমাবেশকে সুশৃঙ্খল ও সফল করতে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, বিএনপিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে মানুষ দলটিকে বিপদে-আপদে পাশে থাকা শক্তি হিসেবে অনুভব করে। বক্তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যুব উন্নয়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দলকে আরও কার্যকর ও জনমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সমাবেশ সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রস্তুতি সভায় জেলা ও মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
একাত্তরেরকথা/এম




















